মঙ্গলবার, ২৪ নভেম্বর ২০২০, ০৬:২১ পূর্বাহ্ন

পরিবারের সদস্যদের যা বলে গেলেন খুনি মাজেদ

Reporter Name
  • আপডেট : শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল, ২০২০
  • ৪১৫ পড়েছেন

গত দু-তিন দিন ধরেই ফাঁসির মঞ্চ প্রস্তুত রাখা হয়েছিল। বৃহস্পতিবার শবে বরাতের কারণে হয়নি, ধারণা করা হচ্ছিল, শুক্রবারে হবে, কিন্তু হয়নি। শেষ পর্যন্ত শনিবার (১১ এপ্রিল) রাত ১২টা ১ মিনিটে কেরানীগঞ্জে স্থাপিত ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আত্মস্বীকৃত ও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত খুনি অবসরপ্রাপ্ত (বহিষ্কৃত) ক্যাপ্টেন আবদুল মাজেদের ফাঁসি কার্যকর হয়। আর এই ফাঁসি কার্যকরের মধ্যে দিয়ে আরও একবার পিতৃহত্যার কলঙ্কমুক্ত হলো জাতি।

পঁচাত্তরের ঘাতক আবদুল মাজেদের যেকোনও সময় ফাঁসি কার্যকরের ইঙ্গিতে শুক্রবার সন্ধ্যায় পরিবারের সদস্যরা কারাগারে তার সঙ্গে দেখা করেন।

মাজেদ পরিবারের সদস্যদের বলেন, ‘আমি আমার কৃতকর্মের ফল হাতে নিয়ে মৃত্যুবরণ করছি। তোমরা যতদিন বেঁচে থাকবে, ততদিন অন্তত ভালো কিছু কোরো। আমি জানি, আমার কারণে তোমাদের বেঁচে থাকাটাও অনেক কষ্টের হবে। অনেকে গালমন্দ করবে। তবুও তোমরা কাউকে কিছু বলবে না।’

কারা সূত্র জানিয়েছে, রাত ১০ টার দিকে মাছ আর সবজি দিয়ে ভাত খেতে দেওয়া হয় আবদুল মাজেদকে। সামান্য একটু খেয়ে পুরোটাই রেখে দেন প্লেটে। এরপর পানি পান করে রাতের খাওয়া শেষ করেন তিনি। এরপর রাত সাড়ে ১১টার দিকে কারা মসজিদের ইমাম মাজেদকে দুই রাকাত নামাজ পড়তে বলেন এবং তওবা পড়ান। তওবা পড়ার সময় চিৎকার করে কাঁদতে থাকেন তিনি।

শেষ ইচ্ছার বিষয়ে জানতে চাইলে মাজেদ কারা কর্মকর্তাদের বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর মতো একজন ব্যক্তিকে মারার দুঃসাহস কারও ছিল না। কিন্তু সেই কাজটা আমিসহ আমরা করেছিলাম। আবারও প্রমাণিত হলো পাপ বাপকেও ছাড়ে না। এতদিন বিদেশে থাকতে পারলাম, আর এখন কেন দেশে এলাম, বুঝতে পারছি না। মরণ আমাকে টেনে এনেছে দেশে। ফাঁসি আমার কপালে ছিল।’ বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।

পরে রাত ১১টা ৫০ মিনিটে কারা সেল থেকে মাজেদকে ফাঁসির মঞ্চে নিয়ে যান সহকারী জল্লাদের দল।

কারা সূত্রে জানা যায়, ফাঁসির মঞ্চে কোনো কথা বলেননি বঙ্গবন্ধুর খুনি মাজেদ। একবারেই নিশ্চুপ ছিলেন।

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর বিগত দুই দশক পা‌লি‌য়ে ভার‌ত গিয়েছি‌লেন আবদুল মাজেদ। গত মা‌র্চের মাঝামা‌ঝি‌ সময় তি‌নি ঢাকায় আসেন। পরে সোমবার (৬ এপ্রিল) রাত ৩টা ৪৫ মিনিটের দিকে গাবতলী বাসস্ট্যান্ডের সামনে থেকে মাজেদকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার ৪৪ বছর ৭ মাস ২১ দিন পর গ্রেপ্তার হন তিনি। সবশেষ শুক্রবার স্ত্রীসহ পাঁচজন কারাগারে মাজেদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ফাঁসির আগে প্রত্যেক আসামিকে পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয়।

গত বুধবার ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ এম হেলাল উদ্দিন চৌধুরী মাজেদের মৃত্যু পরোয়ানা জারির আদেশ দেন। ওইদিন বিকেলে মাজেদ রাষ্ট্রপতির কাছে এ আবেদন করেন। কারা কর্তৃপক্ষ আবেদনটি বিকেলেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দেয়। সেখান থেকে বঙ্গভবনে পৌঁছানো হয়। প্রাণভিক্ষার আবেদনটি বঙ্গভবনে পৌঁছার পরপরই তা খারিজ করে দেন রাষ্ট্রপতি। এটি প্রত্যাখ্যাত হওয়ায় কারা কর্তৃপক্ষের সামনে দণ্ড কার্যকরে বাধা থাকছে না।

এর আগে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় আবদুল মাজেদসহ ১২ আসামিকে ২০০৯ সালে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের মধ্যে সৈয়দ ফারুক রহমান, সুলতান শাহরিয়ার রশীদ খান, বজলুল হুদা, এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদ ও মুহিউদ্দিন আহমেদের ফাঁসি ২০১০ সালের ২৭ জানুয়ারি কার্যকর হয়।

রায় কার্যকরের আগে ২০০২ সালে পলাতক অবস্থায় জিম্বাবুয়েতে মারা যান আসামি আজিজ পাশা। মাজেদ গ্রেফতার হওয়ার পর বর্তমানে পলাতক রয়েছেন পাঁচজন। পলাতক আসামিরারা হলেন- খন্দকার আবদুর রশীদ, শরিফুল হক ডালিম, এস এইচ এম বি নূর চৌধুরী, এ এম রাশেদ চৌধুরী ও মোসলেম উদ্দিন। তারা সবাই সাবেক সেনা কর্মকর্তা। তারা বিভিন্ন দেশে পলাতক পালিয়ে আছেন।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নির্মম বর্বরোচিত ও নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। তখন বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা (বর্তমান প্রধানমন্ত্রী) ও শেখ রেহানা বিদেশে থাকায় প্রাণে বেঁচে যান। ধানমন্ডির ৩২ নম্বর রোডের বাড়িতে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যদের হত্যাকান্ডে সরাসরি অংশ নিয়েছিলেন এই মাজেদ। তখন তিনি ছিলেন সেনাবাহিনীর একজন জুনিয়র কর্মকর্তা।

শেয়ার করুন

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ