রবিবার, ২৯ নভেম্বর ২০২০, ০৫:২৫ পূর্বাহ্ন

চীনের ক্ষতিতে লাভবান হতে পারে বাংলাদেশ

Reporter Name
  • আপডেট : বৃহস্পতিবার, ৫ মার্চ, ২০২০
  • ৮৮ পড়েছেন

করোনা আতঙ্কের পর ক্রেতা ও উৎপাদনকারীদের একাংশ ইতিমধ্যে চীন ছাড়ার কথা ভাবছেন। তারা চীনের পাশাপাশি অন্য উৎস খুঁজছেন। এমতাবস্থায় চীনা অংশীদারেরা ভিয়েতনাম, বাংলাদেশসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে যাওয়ার কথা ভাবতে পারে। ফলে নিঃসন্দেহে লাভবান হবে বাংলাদেশ।

অবশ্য চীনের বাইরে নতুন কোনো দেশ বেছে নেয়া সহজ হবে না। এ বিষয়ে মার্কিন সাময়িকী ফোর্বস এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোনো দেশের চীনের মতো সরবরাহ ব্যবস্থা নেই। কিছু বড় আয়তনের দেশের চীনের মতো করকাঠামো আছে। যার তালিকায় ভারত থাকলেও তাদের সরবরাহ ব্যবস্থা বা লজিস্টিকস সেবার অবস্থা খারাপ। এরপর অবশ্য আসতে পারে মেক্সিকোর নাম। দেশটি এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার সঙ্গে ত্রিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি করেছে।

অন্যদিকে বাংলাদেশের ‘সুযোগ’ বলার পিছনে অন্তত তিনটি কারণ রয়েছে। ঢাকার মতো শহরে অল্প জায়গায় বিপুল মানুষের বাস থাকায় শ্রমিক সহজলভ্য হবে। এছাড়া সিংহভাগ শ্রমিকের ভাষা ও সংস্কৃতি একই, যা শ্রমঘন শিল্পের জন্য জরুরি এবং সর্বশেষ পানির প্রাপ্যতা রয়েছে প্রচুর।

এ বিষয়ে পোশাক খাতের বড় উদ্যোক্তা ও ভিয়েলাটেক্সের চেয়ারম্যান কে এম রেজাউল হাসনাত বলেন, ‘মধ্য মেয়াদে বাংলাদেশের গ্যাস, বিদ্যুতের ঘাটতি থাকছে না। সমুদ্রবন্দরও হচ্ছে। বিনিয়োগকারীরা এলে তাদের স্বস্তিতে কারখানা করার সুযোগটি দিতে হবে।’

অবশ্য চীন থেকে কারখানা সরবে, তার মানে এই নয় যে দেশটি খালি হয়ে যাবে। চীন বছরে প্রায় আড়াই ট্রিলিয়ন (আড়াই লাখ কোটি) ডলারের পণ্য রপ্তানি করে। বাংলাদেশের চেয়ে ৬২ গুণ বেশি। সেখান থেকে কিছু অংশ সরলেও অন্যদের জন্য তা বিপুল।

এদিকে করোনায় ভয়াবহ অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে চীনে। দেশটিতে মৃতের সংখ্যা তিন হাজার ছাড়িয়েছে। বৃহস্পতিবার সকালে চীনের ন্যাশনাল হেলথ কমিশন জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আরো ৩১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে এখন পর্যন্ত দেশটিতে করোনা ভাইরাসে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে তিন হাজার ১৪।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনে নতুন করে আরো ১৩৯ জনের শরীরের এ ভাইরাসে সংক্রমিত হয়েছে। এ নিয়ে আক্রান্তের সংখ্যা ৮০ হাজার ২৭০-এ দাঁড়িয়েছে।

প্রসঙ্গত, ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে চীনের হুবেই প্রদেশের রাজধানী উহান শহরের একটি বন্যপ্রাণীর বাজার থেকে ছড়িয়ে পড়ে প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাস। একপর্যায়ে এই ভাইরাস নিয়ে বিশ্বজুড়ে জরুরি স্বাস্থ্য পরিস্থিতি (হেলথ ইমার্জেন্সি) ঘোষণা করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)।

ভাইরাসটির ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে ইতিমধ্যেই হুবেই প্রদেশের রাস্তায় বন্ধ করে দেয়া হয়েছে সব ধরনের ব্যক্তিগত যান চলাচল। ইতিমধ্যেই করোনা ভাইরাসের উপসর্গ গোপন করাকে ফৌজদারি অরপাধ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে চীনের একটি আদালত। একইসঙ্গে আক্রান্ত হওয়ার উপসর্গ কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে গোপন করলে তার মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে বলে জানানো হয়েছে।

উল্লেখ্য, বর্তমানে ওষুধশিল্প, ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতির কাঁচামাল, স্মার্টফোন, গাড়ির যন্ত্রাংশের অর্ধেকের বেশি উৎপাদন করে চীন। ফলে এত দ্রুত বিকল্প বাজার তৈরি করা কঠিন।

গত ১৫ থেকে ২০ বছর আগে চীনকে ‘বিশ্ব কারখানা’ নামে ডাকা হতো। করোনার কারণে গত ৩০ বছরের মধ্যে চীনা অর্থনীতি সবচেয়ে শ্লথ গতিতে এগোচ্ছে। গত বছরের প্রথমার্ধে চীনের অর্থনৈতিক উন্নতি ছিল মাত্র ৬ ভাগ। কিন্তু চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধে তা নেমে দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৫ ভাগ।

১৯৩০ সালে ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক মন্দা হয়েছিল। অর্থনীতিবিদরা ২০০৭-০৮ সালের অর্থনৈতিক মন্দার সঙ্গে তার তুলনা করেন। করোনার কারণেও সমরূপ অর্থনৈতিক মন্দা ঘটতে পারে বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন তারা।

আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং সংস্থা স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড জানায়, করোনাভাইরাসের কারণে চীনা অর্থনীতির ৪২ ভাগ আক্রান্ত হয়েছে।

বিশ্বের বড় বড় গাড়ি উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোর অধিকাংশ কাঁচামাল উৎপাদন করে চীন। এসব কোম্পানির মধ্যে ভক্সওয়াগেন, টয়োটা, জেনারেল মোটরস, হোন্ডা, হুন্ডায় এর মতো বড় বড় জায়ান্ট কোম্পানিও রয়েছে। কিন্তু করোনার কারণে চলতি বছরের প্রথমার্ধে গাড়ি উৎপাদন ১৫ ভাগ হ্রাস পেয়েছে।

বিশ্বের অন্যতম বিলাসবহুল পণ্য উৎপাদনকারী কোম্পানি ব্রিটিশ ব্যান্ড বারবেরি (বিবিআরইউএফ) চীনে নিজেদের ২৬টি দোকান বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, করোনার কারণে বিলাসবহুল পণ্যের বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

স্মার্টফোনের চিপস উৎপাদনকারী বিশ্বের সবচেয়ে বড় কোম্পানি কোয়ালকম (কিউসিওএম) জানায়, করোনার কারণে চিপসের সংকট তৈরি হবে। ফলে বাজারে স্মার্টফোনের সংকট তৈরি হতে পারে। ইতিমধ্যে মার্কিন মোবাইল কোম্পানি অ্যাপল জানায়, নির্দিষ্ট সময়ে নতুন মোবাইল বাজারে ছাড়তে বেগ পেতে হবে।

এশিয়ার জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ইরান, আফগানিস্তান, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, ইরাক, ইসরাইল, কুয়েত, মালয়েশিয়া, নেপাল, ওমান, পাকিস্তান, কাতার, সিঙ্গাপুর, শ্রীলঙ্কা, তাইওয়ান, থাইল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ভিয়েতনামে করোনা শনাক্ত হয়েছে। তবে এশিয়ায় চীনের পরে করোনায় সবচেয়ে বেশি প্রায় চার হাজার মানুষ আক্রান্ত হয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ গাড়ি উৎপাদনকারী কোম্পানি হুন্ডায় দক্ষিণ কোরিয়ায় সাময়িকভাবে নিজেদের কার্যক্রম স্থগিত করেছে। দেশটির রাষ্ট্রীয় আমদানি-রপ্তানি ব্যাংক বন্ধ ঘোষণা করেছে। ব্যাংকের আট শ কর্মকর্তাকে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বাড়ি থেকে বের হতে নিষেধ করা হয়েছে।

এশিয়া মহাদেশের পরে করোনা ইউরোপ মহাদেশে দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়ছে। গত ৫ বছর আগে শরণার্থী সংকটের চেয়ে ভয়াবহ হিসেবে করোনাকে ইউরোপে বিবেচনা করা হচ্ছে। ২৭টি সদস্য রাষ্ট্র নিয়ে গঠিত ইউরোপীয় ইউনিয়নের বার্ষিক জিডিপির পরিমাণ ১৬ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার।

ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে করোনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ইতালি। এখানে হাজারের বেশি ব্যক্তি করোনায় আক্রান্ত হয়েছে।

ইতালির প্রধান শিল্পাঞ্চল লোমবারডি শহর কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে গেছে। দেশটির শিল্প থেকে মোট আয়ের ৪০ ভাগ আসতো লোমবারডি থেকে। ইতালির ভেনিসে কার্নিভাল উৎসব ও মিলানে ফ্যাশন সপ্তাহ বাতিল করা হয়েছে।

করোনায় প্রায় ৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন ইউরো ক্ষতি হতে পারে। উপরন্তু করোনা মোকাবেলায় ইতালি আরো ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা করছে। আগামী ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত মিলানের সঙ্গে বিমান সার্ভিস বাতিল করেছে আমেরিকান বিমান সংস্থা। ইতালি থেকে যুক্তরাজ্য, স্পেন, গ্রিস, ক্রোয়েশিয়া, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, সুইজারল্যান্ড, রোমানিয়া, নেদারল্যান্ডস, অস্ট্রিয়া, জার্মানি, সুইডেন, নরওয়ে, বেলজিয়াম, ডেনমার্ক, এস্তোনিয়া, উত্তর মেসেডোনিয়া, সান মারিনোয়ও করোনাভাইরাস ছড়িয়ে গেছে।

অস্ট্রিয়া, ফ্রান্স, স্প্যানিশ দ্বীপের হোটেলগুলো বন্ধ রয়েছে। গত বছরের তুলনায় চলতি বছর থাইল্যান্ডে পর্যটকের সংখ্যা ৫০ ভাগ কমে গেছে। সম্প্রতি থাইল্যান্ডে ভাড়া কমানোর দাবিতে ফ্ল্যাশ মবও হয়েছে। দোকানদারদের দাবি, পর্যটক না আসায় প্রত্যাশানুযায়ী বিক্রি হয়নি।

ফ্রান্সেও অনুরূপ পরিস্থিতি। করোনার কারণে দেশটিতে ৩০ থেকে ৪০ ভাগ পর্যটক কমে গেছে। এছাড়া একসাথে পাঁচ হাজারের বেশি মানুষের সমাবেশ নিষেধাজ্ঞার কারণে প্যারিসের লোভর জাদুঘর বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

জার্মানিও অর্থনীতিতে বড় ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। কারণ চীন দেশটির সবচেয়ে বড় রপ্তানিকারক দেশ। গত শনিবার জার্মানির ব্যাংক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ফ্রাঙ্কফুটে করোনায় আক্রান্ত একজন শনাক্ত হয়েছে।

অন্যদিকে করোনা মোকাবেলায় পুরো যুক্তরাজ্য কোয়ারেন্টাইনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। ফলে যুক্তরাজ্যের মোটা অঙ্কের লোকসান গুনতে হবে।

করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ভোগ্যপণ্য উৎপাদনকারী কোম্পানি নেসলেসহ এল’ওরিয়েল, ইউনিলিভার কর্মকর্তাদের প্রতি ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।

তিনটি কোম্পানিতে বিশ্বের প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ কাজ করে। বিশ্বের অধিকাংশ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। লন্ডনে শেভরনের কর্মকর্তাদের বাড়ি থেকে অফিসের জরুরি কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এছাড়া ইতালির ইউনিক্রেডিট (ইউনিসেফ) ও নেদারল্যান্ডের আমস্টারডামভিত্তিক প্রযুক্তি গ্রুপ প্রোসাস (প্রোসাই) কর্মকর্তাদের ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। মার্কিন কৃষি কোম্পানি কারগিলও একই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

মার্কিন অনলাইন বিক্রির জায়ান্ট কোম্পানি আমাজনও ৮ লাখ কর্মকর্তাকে দেশের অভ্যন্তরে ও বাইরে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ভ্রমণ না করতে নির্দেশ দিয়েছে।

শেয়ার করুন

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ